সামাজিক পরিবর্তনের কারণ গুলি কি কি?

সমাজ কোন একক কারণে পরিবর্তিত হয় না। সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান ভূমিকা
পালন করে। নিম্নে সামাজিক পরিবর্তনের কারণগুলো আলোচনা করা হল :

(১) প্রাকৃতিক কারণ – বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্যুৎপাত প্রভৃতি প্রাকৃতিক কারণে
প্রাকৃতিক পরিবেশের অর্থাৎ আবহাওয়া, জলবায়ু এবং ভূমির গঠন-প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে । এর
সাথে সাথে সমাজের জীবন-যাপন পদ্ধতিরও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে সামাজিক পরিবর্তন হয়।

(২) অর্থনৈতিক কারণ – অর্থনৈতিক পরিবর্তন সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম কারণ । উৎপাদন
পদ্ধতির পরিবর্তন হলে সমস্ত উপরিকাঠামোতে পরিবর্তন সাধিত হয়। উৎপাদন পদ্ধতি দুটি
উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। একটি হল উৎপাদন শক্তি আর অন্যটি হল উৎপাদন সম্পর্ক। মার্কসের
মতে যখন উৎপাদন শক্তিতে পরিবর্তন আসে তখন উৎপাদন সম্পর্কের উপর তার প্রভাব পড়ে। এই
উৎপাদন সম্পর্ক দ্বারা সমথ সমাজের পরিবর্তন বুঝা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন যে, আদিম
সাম্যবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে উত্তরণের কারণ হল অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার
পরিবর্তন । তদ্রুপ শিল্পায়নের ফলে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন ঘটে আধুনিক শিল্প নির্ভর
শহুরে সমাজের আবির্ভাব ঘটেছে। ফলে সাদামাটা জীবন-যাপন প্রণালীর পরিবর্তে কৃত্রিম ও যান্ত্রিক
জীবন-যাপন পদ্ধতি সূচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণ তাই সমাজ পরিবর্তনের গুরুতৃপূর্ণ উপাদান ।

(৩) রাজনৈতিক কারণ – রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। ক্ষমতার
পরিবর্তন ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে সমাজের রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তন ঘটে । এই
পরিবর্তন অনেক সময় সমাজের অর্থনৈতিক জীবন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৪৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে সাম্যবাদী ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে সেখানে
উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা এবং শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। ব্যক্তি মালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয়
মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সমাজের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট
পরিবর্তনের ফলে শাসন ব্যবস্থা ও জনগণের রাজনৈতিক আশা-আকাজঙ্কার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে তা জনগণের আকাঙ্কার ক্ষেত্রে
বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে।

(৪) ধর্মীয় কারণ – ধর্মীয় কারণেও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। যেমন_ ম্যাক্স ওয়েবারের মতে
পুঁজিবাদী সমাজ সৃষ্টির জন্য প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম দায়ী। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে প্রটেস্ট্ান্ট ধর্ম দ্বারা
পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় দর্শন ছিল, ‘কর্মই দেবতা” । “কাজ করেই
ঈশ্বরের নৈকট্য পাওয়া যাবে’। এই দর্শনে প্রভাবিত হয়ে প্রটেস্ট্যান্টরা কর্মে ঝাপিয়ে পড়ে। ব্যবসা-
বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা পুঁজির পাহাড় গড়ে তোলে ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি
স্থাপন করে। ধর্মীয় ধ্যান ধারণা ও আদর্শ সমাজের আমুল পরিবর্তন ঘটায় । যেমন_ ইসলাম ধর্মের
আবির্ভাবের ফলে পৌত্তলিক সমাজের পরিবর্তে এক আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য ভিত্তিক ইসলামী সমাজ
ব্যবস্থা গড়ে উঠে।

৫) সাংস্কৃতিক কারণ – সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম কারণ । উইলিয়াম এফ.
অগবার্ন বলেন, “সংস্কৃতির ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে পুরাতন সংস্কৃতির বিলোপ এবং নতুন সংস্কৃতি
নির্ভর সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠে।” তিনি সংস্কৃতির দুটি ভাগ করেছেন_বস্তগত সংস্কৃতি ও অবস্তগত
সংস্কৃতি। অগবার্ন বলেন, যখন বস্তগত সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তন আসে তখন ধীরে বা মন্থর গতিতে
অবস্তগত সংস্কৃতির মধ্যেও একটা পরিবর্তন দেখা দেয়। এই অবস্তগত সংস্কৃতির পরিবর্তন সামাজিক
পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। যেমন ডিস এ্যানটিনা ও কম্পিউটারের মাধ্যমে বন্তগত সংস্কৃতির
পরিবর্তনের ফলে সমাজের চিন্তাধারা ও কাজের ধরনের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়ে সামাজিক
পরিবর্তন ঘটছে। বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ফলে প্রচলিত সংস্কৃতি ধীর গতিতে লোপ পাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তি ও বিস্তরণের ফলে এবং বিদেশী সংস্কৃতির ভাল দিক সংযোজিত হওয়ার ফলে দেশীয়
সংস্কৃতির ইতিবাচক উন্নয়ন সামাজিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।

(৬) সংস্কার ও বিপ্লব – সংস্কার ও বিপ্লবের ফলেও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে । সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থাযখন জনকল্যাণ বিরোধী এবং অথ্গতির পথে বাধা হয়ে দীড়ায় তখন সমাজ সংক্কারকদের আন্দোলনসমাজের কাঙ্কিত পরিবর্তন আনয়ন করে। রাজা রাম মোহন রায়ের সংস্কার হিন্দু সমাজের প্রচলিত সতীদাহ প্রথা বিলোপ এবং বিধবা বিবাহ প্রথার জন্ম দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top